পোস্তবাটা ও আলুপোস্ত: বাঙালির স্বাদ, স্মৃতি ও আঞ্চলিক খাবারের গল্প

পোস্তবাটা, আলুপোস্ত ও পোস্তবড়া: বাঙালির স্বাদ, স্মৃতি ও আঞ্চলিক রান্না

এখনকার ব্যস্ত দিনে একদিনের বাঙালি হয়ে ওঠা টাই সহজ । তাই বিজ্ঞাপনে বাঙালির রসনা উৎসব - বৈশাখী / শারদ / জামাইষষ্ঠী / ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ঘরোয়া ভোজ আর সাবেক খাওয়াদাওয়ার খোঁজ মিলবে মার্কোপোলো রেস্তোরাঁ, বৈদিক ভিলেজ, পার্ক প্লাজার কে নাইনটিন, ওহ্! ক্যালকাটা, তাজ হোটেল, আহেলী, কিউপিজ - এ । মেনু পড়লেই অর্ধেক খাওয়া হয়ে যাবে, যাক ।

'শুধু ভাত আর পোস্তবাটা ব্যাস'

Bengali posto bora with aluposto and posto bata served in a rustic kitchen setting with mustard oil and poppy seedsকা
পোস্তবাটা, আলুপোস্ত আর তাওয়ায় ভাজা পোস্তবড়া—বাঙালির গরমের আরাম, ঘরের স্বাদ আর স্মৃতির এক থালা।

বৈশাখ শুরু মাঝ এপ্রিলে কিন্তু মার্চের শেষ থেকেই পোস্ত শাসন শুরু, বাঙালির গরমের আরাম এই পোস্ট আর পান্তা । 'শুধু ভাত আর পোস্তবাটা ব্যাস', আমার মতন অনেক বাঙালিকেই বলতে শুনবেন এই সংলাপ । পোস্তবাটা মানে শুধুই পোস্তবাটা। সঙ্গে একটু কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা কুচি আর নুন স্বাদ অনুসারে ।

ওই পোস্তবাটা দিয়ে একথালা ভাত নিমেষে উড়িয়ে দিতে পারে বাঙালি । ও জিনিস এমনই যে, সঙ্গে বিউলির ডাল আর আলুভাজা থাকলে ভালো, না-থাকলেও ভালো। পোস্ত আর কাঁচা লঙ্কা একসঙ্গে বাটতে হবে অল্প জল দিয়ে, তার পর বাটা শেষ হলে বাটিতে নিয়ে নুন, কাঁচা সরষের তেল আর কাঁচা পেঁয়াজ কুচি পোস্ত ।

শাক ভাজায় পোস্ত ছড়ানোর কিংবা পটল ঝিঙে ডাঁটা এমন কি ফুলকপি পর্যন্ত পোস্ত দিয়ে খুব সুন্দর হয়। কাঁচা তেঁতুলের চাটনি পোস্ত বাটা দিয়ে চমৎকার লাগে ।পোস্ত যে রান্নাতেই দেওয়া হোক তারই স্বাদ বেড়ে যায় বলে আমার ধারণা।

খাঁটি ও নিখুঁত আলুপোস্তর খোঁজে

গৃহস্থ বাড়ি ছাড়া আর খুব ভালো পাওয়া যেত আসানসোলের কোর্ট এলাকার ‘গঙ্গা’ হোটেলে। খাবার পর যতই আফসোস করি না কেন, হোটেলে পোস্ত পেলে সব ফেলে খেয়ে দেখতেই হয়, এমনি তার আকর্ষণ । আজকাল ঠিকঠাক পোস্ত পাওয়া দুর্লভ, অভিযোগ করলে উত্তর আসবে দামের কথা, পোস্ত চাষের সীমাবদ্ধতার কথা । সঙ্গে সাদা তিল আর চরমগজ মিশিয়ে পোস্ত বাটা দিয়ে তরকারিই যদি খাবো অতো দাম দিয়ে দোকানে কেন খাবো?!

তবে পোস্তবাটা দিয়ে ঠিকঠাক আলুপোস্ত রান্না করা সহজ নয় কিন্তু। আলুপোস্তর স্বাদ কী ভাবে উৎকৃষ্ট পর্যায়ে নিয়ে তোলা যায় তার এক মা-ম্যাজিক আছে । এমনিতে আলুপোস্তয় বা পোস্ত বাটা দিয়ে রাঁধা যে কোনও নিরামিষ আইটেমে ফোড়ন আর হলুদ পারতপক্ষে দিতে নেই, কারণ পোস্তর স্বাদ-গন্ধকে অনেকটাই মেরে দেয় হলুদ আর ফোড়ন। কিন্তু আলুপোস্তর রং হবে হালকা হলুদ । তার জন্যে মা-র টিপস হলো খানিকটা পাকা লঙ্কা বেটে কড়াইয়ে দাও আলুর সঙ্গে পোস্ত দিয়ে কষানোর মাঝপথে।

কিন্তু মাস্টারস্ট্রোক অন্য জায়গায়। যতটা পোস্ত দেবে, সেটা সমান দু-ভাগে ভাগ করতে হবে। একটা ভাগ মিহি করে বেটে নিতে হবে, অন্য ভাগটা থাকবে আধবাটা। মিহি করে বাটা পোস্ত দিতে হবে আলুটা কষানোর সময়ে। তার পর জল দিতে হবে। আর রান্না যখন প্রায় হয়ে আসবে তখন ওই আধবাটা পোস্ত গোল করে ঘুরিয়ে দিতে হবে কড়াইয়ে। আলুপোস্তয় সে ক্ষেত্রে একটা পিচ্ছিল ভাব আসবে। যাতে স্বাদ বাড়বে বেশ কয়েক গুণ। তার পর আর একটু রান্না করে নামাতে হবে। বাটার সময় কয়েকফোটা কাঁচা সরষের তেল দিতে পারো, পরে না দিলেই ভালো । আমাদের বাড়িতে আলুপোস্ত অল্প ঝোল ঝোল খাওয়াটাই দস্তুর।

পোস্তর শুকনো ভাজা

পোস্ত এবং শুকনো লঙ্কা ভালো করে খোলায় ভেজে নিতে হবে। তার পর হামানদিস্তায় ওই ভাজা পোস্ত ও ভাজা শুকনো লঙ্কার সঙ্গে সৈন্ধব লবণ গুঁড়ো করতে হবে, তবে পুরোপুরি গুঁড়ো নয়, গোটা মিশ্রণটা আধভাঙা মতো হবে। সেটা শিশিতে রেখে দিলে সপ্তাহ দুয়েক থাকবে। গরম ভাতে ঘি আর ওই পোস্ত ভাজা দিয়ে তার সঙ্গে একটু আলুভাজা।

পোস্তসেদ্ধ

আসামের পোস্তর আর একটা বিশেষ আইটেমের কথা শুনেছিলাম। আমার বাবা শৈশবে পিতৃহারা হবার পর জ্যেঠার বাড়িতে থাকতেন । স্কুলে রওনা হওয়ার সময়ে খেয়ে যেতেন ফেনা ভাত, ঘি, আলুসেদ্ধ আর পোস্তসেদ্ধ। ভাত যখন ফুটবে, তখন সেই হাঁড়ির মধ্যে নেকড়ায় বেঁধে রাখা পোস্তবাটা সেদ্ধ হবে চালের সঙ্গেই। আলুপোস্ত, পোস্তবাটা, পোস্তর বড়ার মতো আইটেমের কথা বাঙালি হলেই জানা উচিত। কিন্তু পোস্তসেদ্ধ?

অদ্ভুত ভালো খেতে। পোস্তবাটা বার বার খেলেও একঘেয়ে লাগে না। তা সত্ত্বেও পোস্তবাটার বদলে একদিন একটু অন্য রকম কিছু খেতে চাইলে পোস্তসেদ্ধ হলো আদর্শ। তবে তাতে বিস্তর খাটুনি আছে। সবার আগে খুব মিহি করে পোস্ত বাটতে হবে — যতটা মিহি করা সম্ভব, ততটাই। প্রিপারেশন হিসেবে পোস্তবাটা খেতে হলে যতটা জল পড়ে, এ ক্ষেত্রে তার চেয়ে কম জল দিতে হবে। কারণ, পোস্তসেদ্ধর প্রাথমিক পর্বে পোস্তবাটার পর ওই পোস্ত আলুসেদ্ধর মতো ডেলা পাকাতে হবে হাতে নিয়ে। তারপর ওই পোস্ত পরিষ্কার একটা সাদা নেকড়ায় ভরে বেঁধে দিতে হবে, যাতে বেরিয়ে না-যায়, তেমন ভাবে।

ভাতের জন্য হাঁড়িতে যখন চাল ফুটবে, তখন পোস্তবাটার ডেলা সমেত ওই নেকড়া হাঁড়িতে ফেলে দিতে হবে। ভাত হয়ে যাওয়ার পর পোস্তবাটা ভরা ওই নেকড়া বার করে আনতে হবে। ততক্ষণে চাল ফুটে যেমন ভাত রান্না হয়েছে, তেমনই তার সঙ্গে নেকড়ায় ভরা কাঁচা পোস্তবাটা থাকায় তা পরিণত হয়েছে পোস্তসেদ্ধয়। ওই পোস্তসেদ্ধ মাখতে হবে নুন, কাঁচা লঙ্কা কুচি আর অল্প সরষের তেল দিয়ে। অনেক সময়ে কাঁচা পোস্তবাটায় অম্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে কারও কারও, আবার গরমে কাঁচা পোস্তবাটা কিছুক্ষণ রেখে দিলে, সঙ্গে সঙ্গে না-খেলে টকে গিয়ে নষ্ট হওয়ারও ভয় রয়েছে। পোস্ত সেদ্ধয় কিন্তু সেই সব ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

পোস্তবড়া

পোস্তবড়া - খাঁটি পোস্তবড়া কড়াইয়ে ভাজতে গেলে ভেঙে যাবে। যদি না ভাঙে, তা হলে বুঝতে হবে, ওটা ভালো প্রজাতির পোস্তবড়া নয়, খাদ বেশি, পোস্ত কম। শুধুই পোস্ত দিয়ে পোস্তবড়া তৈরি করা সম্ভব নয়। তাতে বাঁধুনি আনতে আটা বা ময়দা দিতে হবে খুব সামান্য পরিমাণে। তার পর নুন-পেঁয়াজ কুচি-কাঁচা লঙ্কা কুচি মিশিয়ে গোল ও চ্যাপ্টা আকার দিয়ে তাওয়ায় অল্প তেল দিয়ে এ পিঠ-ও পিঠ করতে হবে। খাঁটি পোস্তর বড়া কখনও ডুবো তেলে ভাজা হয় না, তাওয়ায় অল্প তেল গরম করে তাতে এ পিঠ-ও পিঠ করতে হয় মাত্র। পোস্তর বড়ার ভিতরটা একটু কাঁচা কাঁচা থাকবে। ওটাই মজা। উপরে ভাজা ভাজা একটা ব্যাপার অথচ সেটা ভেদ করে ভিতরে ঢুকলেই পোস্তবাটা পোস্তবাটা অনুভূতি।

আঞ্চলিক জনপ্রিয়তা ও পথের স্বাদ

হাওড়া হুগলি থেকে শুরু করে বর্তমান বীরভূম বাঁকুড়া পুরুলিয়ায় এই খাবারটি খুবই জনপ্রিয়। বাঁকুড়া, বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, এমনকী পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান বা বালুরঘাট শহরে কখনো ঘুরতে গেলে তাদের আঞ্চলিক-জাতীয় পদটি না খেয়ে ফিরলে বাঙালির জাত যায় বলা যায় । যেমন ডুয়ার্সের লাটাগুড়িতে গোরুমারা জাতীয় উদ্যান ব্লু বেরি হোটেল অ্যান্ড রিসর্ট-এ বিখ্যাত পটল পোস্ত । মেদিনীপুর শহরে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিস্ট লজ ‘মৃত্তিকা’ ওখানেও তাওয়ায় তৈরি হয় পোস্তবড়া। জঙ্গলমহলে মাছ থেকে আমড়ার চাটনি সব হলো জেলা পোস্ত স্পেশাল ।

ঐতিহাসিক সূত্র ও নন্দলাল মন্দির

বিষ্ণুপুরের অদূরে বীরসিংহ গ্রামে সপ্তদশ শতাব্দীর নন্দলাল মন্দির : চৌকো বেদীর ওপরে নির্মিত একচালা মন্দিরটির বাঁকানো ছাদ এক শিখর বিশিষ্ট, আদি দোলমঞ্চ ও রথঘর। অনেক গবেষকের মতে ১৬৪৩-৪৬ বর্ষে মল্পরাজ রঘুনাথ সিংহ এটির প্রতিষ্ঠা বা সংস্কার করেন। দেবোত্তর আর থেকে নিত্যভোগ ছিল ১ শালি (১৮ কেজি) অন্ন, কচি শালপাতায় পোড়া পোস্ত ও বিরি কলাই ডাল । বাংলায় আফিঙের বীজ থেকে যে প্রথম রান্নার পোস্তর তথ্য-প্রমান প্রথম এইখানেই পাওয়া গেলো তাহলে ।

আফিং ০pium ছোট গাছ, অনেকটা শেয়ালকাঁটা গাছের মত, papaver somniferum. ফল যাহাকে ঢেড়া বা খসখস বলে, ঢেড়া ভাঙলে যে আঠা বের হয় তাহাকে আফিং ও ভিতরের বীজকে পোস্ত বা খসাতিল বলে। ভারতে আগে জানা ছিল না, গ্রীকরা এর আবিষ্কর্তা, একে অপিওন বলত ।

বাঁকুড়ার হোটেলের পোস্তর বড়া

বাঁকুড়ার ঝিলিমিলির পরাডি মোড়ে মনোরঞ্জন প্রামাণিকের ভাত খাওয়ার হোটেলে। ওই হোটেলের মতো পোস্তর বড়া, দেশি মুরগির ঝোলের তুলনা মেলা ভার। খদ্দের বা অতিথি অর্ডার দিলে সেই বুঝে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পোস্তর বড়া তাওয়ার ধার থেকে সরিয়ে তাওয়ার মাঝখানে রাখা তেলে নাড়াচাড়া করে তার পর পাতে দেওয়া হচ্ছে।

জেলার ছড়া ও লোকমুখে পোস্ত

বাঁকুড়ার প্রচলিত ছড়া:-

পোস্ত পোড়া, বিউলির ঝোল। তবে জানবি বাঁকিসোল ॥
মুড়ি, পোস্ত, কুকড়ার (মোরগের) লড়াই -
এই তিন নিয়ে বাঁকড়োর বড়াই ॥

বীরভূম প্রচলিত ছড়া:-

পুঁই, পোস্ত, কলাইয়ের ভাল।
এই তিনে বীরভূমের চাল ॥

লাউ, পোস্ত, কচুর ধুম।
তবে জানবি বীরভূম॥

খায় পোস্ত, মারে ঘুম,
বাড়ি কোথা? না, বীরভূম ॥

বর্ধমান জেলার আঞ্চলিক রান্না আর প্রচলিত ছড়া:-

কলাই ডাল বড়ি পোস্ত কুমড়ো কচুর ঘ্যাট
পুঁটি মাছের অন্বল সহ বর্ধমানের খ্যাট।

এখানে কলাই বাটার সঙ্গে সামান্য লবণ, জিরা পোস্ত দানা দিয়ে ভাল করে ফেনিয়ে খুব ছোট ছোট করে ভাজা বড়ি দেওয়া হয়। এই বড়ি গোটা গোটা তেলে ভেজে ভাতের সঙ্গে খেতে সুস্বাদু।

বাঙালি ঘরের পোস্তর নানাবিধ পদ

বাঙালি বাড়িতে পোস্তর নানাবিধ পদ নিয়মিত হতো এককালে — ঢেঁড়স পোস্ত, ডিম পোস্ত, চিচিঙ্গে পোস্ত, ধুন্ধুল পোস্ত, পটল পোস্ত, বাঁধাকপি পোস্ত। খেয়াল রাখবেন, পোস্ত যেন ভাজা না হয়ে যায়। তা হলে কিন্তু স্বাদটা ঠিকঠাক আসবে না। পোস্ত দিয়ে তরকারি রাঁধায় কোনও ফোড়ন বা হলুদ দেওয়া চলবে না। পোস্ত যে রান্নাতেই দেওয়া যায় তারই স্বাদ বেড়ে যায় ।

এদেশে পোস্তর যতরকম পদ আছে তার মধ্যে প্রধান হল পোস্ত বাটা, পোস্তর বড়া আর পোস্ত ছড়িয়ে লাউয়ের খোসা আলুর খোসা ভাজা। আর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠের গরমে যে কাঁচা বিউলি ডালের সঙ্গে আলুপোস্ত । আজকাল মাছ-মাংসতেও দক্ষ রাঁধুনীরা পোস্ত চালিয়ে দিয়ে স্বাদে নতুনত্ব নিয়ে আসছেন। এসেছে মুরগির ডিম পোস্ত ভাঁপা । শাক ভাজায় পোস্ত ছড়ানোর চল বরাবরই আছে। পটল ঝিঙে ডাঁটা এমন কি ফুলকপি পর্যন্ত পোস্ত দিয়ে খুব সুন্দর হয়। পোস্ত বাটা দিয়ে কাঁচা তেঁতুলের নিরীহ দেখতে এক অসামান্য চাটনি শহুরে বাঙালি ভুলেই গেছে প্রায়, একমাত্র জেলাতেই এর দেখা মেলে এখনো ।

জেলার বেশীর ভাগ লোক হত-দরিদ্র, তাদের প্রধান খাদ্য মোটা চালের ভাত, কলাইয়ের ডাল, আলু বা বড়ি পোস্ত আর কচু কুমড়োর একটা ঘ্যাঁট জাতীয়। যদি ভাগ্যে জোটে তো পুঁটি মাছের অম্বল। জেলার রুক্ষ আবহাওয়ার উপযোগী এই পোস্ত, কলাই-এর ডাল ও অম্বল। প্রধান উৎপন্ন তরকারী কচু, কুমড়ো, তাই দিয়ে পোস্ত বাটার সংযোগে বড়া, শুকতো, ঘণ্ট রান্না করে, অপূর্ব তার স্বাদ । দুই এক চামচ চাল ভিজিয়ে তার সঙ্গে পোস্তদানা গুলি বেটে নেওয়া হয় । লাউ কুমড়া ও অমৃতমানের পাতায় মুড়ে লবন ও লঙ্কা যোগে পোস্ত বাটা পুড়িয়ে বা সিদ্ধ করে খায় । বৃষ্টির দিনে তাদের বাড়িতে খাবার সঙ্কুলানে অবধারিত হলো একবাটি ঘন কঁড়াইয়ের ডাল, আলুভাতে আর পোস্ত। শেষ পাতে একটু অম্বল ।

মা’র রান্না ও পারিবারিক স্মৃতি

আমার মা গ্রামের মেয়ে কোনোদিন ছিল না । তবুও উচ্চশিক্ষিতা আমার মা'র মতন ধপধপে সাদা দুধেশ্বর চালের ভাত, সোনালি মুগের ডাল, পোস্ত বড়া, নারকেল কুচি দিয়ে মোচার ঘণ্ট, তেল কই, জলপাইয়ের চাটনি, রোজ সকালে রান্না করে মা'র ঠিক সময় অফিস যেতে কাউকে দেখিনি আমি। আর মার মতন রান্নাও না। সব রান্নার আলাদা গন্ধ দূর থেকে পাওয়া যেতো। কি রান্না হচ্ছে না বললেও পরিষ্কার বোঝা যেতো । এ বড় বিস্ময় ছিল সবার কাছে ।

মা রকমারি পাতুরির গল্প খুব করতেন। সুযোগ পেলেই কড়াইয়ে তেল মেখে ঢিমে আছে এটা ওটার পাতুরি করতে এক্সপার্ট ছিল মা, সে নরম কাঁটা কম মাছ-ই হোক বা পছন্দের সবজি লাউ শাকের পুটুলিতে পোস্ত-সর্ষে । বাংলাদেশের বাড়িতে নাকি তিনি মাঝেমধ্যেই কলা পাতায় পাতুরি খেতেন। ইলিশ-ভেটকি তো ছিলই। ছোট ছোট মাছ দিয়ে পাতুরি, মটর ডালের পাতুরিরও গল্প শুনেছি। কুচো মাছকে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচালংকা বাটা, সর্ষের তেল, নুন দিয়ে মেখে কলাপাতায় জড়িয়ে চাটুতে দিয়ে রান্না করতেন। একইভাবে করতেন মটর ডালের পাতুরিও। মটর ডাল বাটা, পোস্ত আর নারকেল বাটা, কাঁচালংকা সরষের তেল, নুন মিষ্টি দিয়ে মেখে কলাপাতায় জড়িয়ে চাটুতে ফেলে রান্না করা হত। আর একটা খাবার হল বড়িভাতে। বড়ি ভেজে ভাতে দিয়ে সেটায় নুন কাঁচালংকা তেল মেখে খেতে খুব ভালোবাসতেন।

পোস্ত দিয়ে তেঁতো শুকতো

মহাপ্রভু সুমিষ্ট পঞ্চামৃত থেকেও এই তেঁতো সুক্ত খেতে বেশি ভালবাসতেন। বিচিত্র রকমের সুক্ত রয়েছে। সুক্তের সঙ্গে ভাজা ডালবড়ি চূর্ণ মিশিয়ে, বাদাম কিংবা নারকেল এবং রাঁধুনী বাটা মিশিয়ে কিংবা একটু দই (ঘুটে নিয়ে) মিশিয়ে সুক্তর রঙ, গন্ধ এবং স্বাদে বৈচিত্র্য আনা যায়। ভোজের প্রথমেই সুক্ত পরিবেশন করতে হয়। তাতে ক্ষুধা এবং রুচি বৃদ্ধি পায়। সুক্ত ছাড়া ভোজ অসম্পূর্ণ।

উপকরণ

৪ টেবল চামচ সাদা পোস্ত; আধ টেবল চামচ কালো সরষে; প্রায় আধ কাপ জল; ২ খানা ছোট করলা (কিংবা ২৫ গ্রাম শুকনো করলা), ১ টেবল চামচ নুন; ১ ইঞ্চি তাজা আদা (খোসা ছাড়ানো); ১-২ খানা ঝাল কাঁচা লঙ্কা; ৩ টেবল চামচ ধনেপাতা কুচি (পাওয়া গেলে); প্রায় আধ কাপ দুধের সর; ৫০০ গ্রাম ঘি (বা তেল); ৩ খানা আলু (খোসা ছাড়িয়ে ১ ইঞ্চি লম্বা ডুমো করে কাটা); ১ খানা মাঝারি আয়তনের কাঁচা কলা; ২ খানা ছোট বেগুন; সামান্য পেঁপে এবং অনুরূপ শক্ত সজি (সব আলুর মতো করে কাটা); ৪ টেবল চামচ ঘি; ছোট ১ চামচ পাঁচফোড়ন; আড়াই কাপ জল বা ' আখনির ঝোল; ছোট ১ চামচ গরম মশলা।

প্রস্তুত পদ্ধতিঃ

  1. পোস্ত এবং সরষে বাছাই করুন। একত্রে মিশিয়ে এক রাত ভিজিয়ে রাখুন। সঙ্গে সামান্য রাঁধুনীও ভিজাতে পারেন।
  2. পরের দিন তাজা করলা লম্বা লম্বা করে কাটুন এবং তাতে নুন ছিটিয়ে ২০ মিনিট রেখে দিন। পরিষ্কার করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে হাওয়াতে শুকিয়ে নিন।
  3. পোস্ত এবং সরষের মিশ্রণটি জল থেকে তুলে অল্প অল্প জল দিয়ে মিহি করে বাটুন। সঙ্গে কিছু ঝুনো নারকেল কোরা বাটতে পারেন। আদা, লঙ্কা এবং ১ টেবল চামচ ধনেপাতা তার সঙ্গে মিশিয়ে বাটুন। উক্ত মিশ্রণে দুধের ঘর সর (বা সামান্য দই) দিয়ে ভাল করে ঘুটে নিন। একটি পাত্রে মিশ্রণটি ঢেকে রাখুন।
  4. ৫০০ গ্রাম ঘি গরম করে করলা ও সমস্ত প্রকার শক্ত সব্জির টুকরোগুলি পর্যায়ক্রমে হালকা বাদামী করে ভাজুন এবং নামিয়ে যি ঝরান। কড়াইটি আঁচ থেকে নামান।
  5. অন্য একটি কড়াইতে ৪ টেবল চামচ ঘি ঢালুন। মাঝামাঝি আঁচে ঘি গরম করুন। ধোঁয়া ওঠার পূর্ব মুহূর্তে পাঁচ ফোড়ন দিয়ে ফোড়ন দিন। মেথি যখন লালচে হয়ে আসবে, তখন পোস্ত সরযের মিশ্রণটি একটু একটু করে ঢেলে দিন। ঘন ঘন নাড়তে থাকুন। সামান্য ভাজা ভাজা হয়ে এলে জল বা আখনির ঝোল ছাড়ুন। প্রায় ১০ মিনিট অল্প আঁচে নেড়েচেড়ে সিদ্ধ করুন।
  6. সমস্ত ভাজা সব্জি, অবশিষ্ট নুন এবং গরম মশলা (ইচ্ছে করলে কিছু ভাজা ভালবড়ি) ফুটন্ত পোস্ত মিশ্রণে ঢালুন। ধীরে ধীরে নাড়ুন। কড়াইটি ঢেকে দিন। নীচু আঁচে প্রায় ১৫ মিনিট ফুটিয়ে নামান। অবশেষে ধনেপাতা কুচি ছিটিয়ে অন্ন ব্যঞ্জন সহযোগে নিবেদন করুন।

আরও পড়ুন: নারকেল-পোস্ত বড়া রেসিপি পোস্টটি

প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

পোস্তবাটা কীভাবে খাওয়া হয়?

পোস্তবাটা সাধারণত ভাতের সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কা ও সরষের তেল মিশিয়ে খাওয়া হয়। এটি গরমকালের একটি জনপ্রিয় বাঙালি খাবার।

আলুপোস্তের আসল স্বাদ কিভাবে বাড়ানো যায়?

পোস্তকে দুই ভাগে বেটে—একভাগ মিহি ও একভাগ আধবাটা—রান্নার শেষে আধবাটা পোস্ত দিলে আলুপোস্তের স্বাদ অনেক বেশি বাড়ে।

পোস্তবড়া ভাজার সঠিক পদ্ধতি কী?

খাঁটি পোস্তবড়া তাওয়ায় অল্প তেলে ভাজা হয়। ডুবো তেলে ভাজা হলে আসল স্বাদ নষ্ট হয়।

পোস্তসেদ্ধ কীভাবে তৈরি করা হয়?

পোস্তবাটা কাপড়ে বেঁধে ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ করে পরে নুন, কাঁচা লঙ্কা ও সরষের তেল দিয়ে মেখে খাওয়া হয়।

বাঙালির রান্নায় পোস্ত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

পোস্ত বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা গরমকালে আরাম দেয় এবং নানা পদে স্বাদ বাড়ায়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ধোঁয়া ওঠা ঘুগনি: বাঙালির সহজ রাস্তার খাবারের গল্প

কলকাতার ফুচকা : ছোটবেলার লুকিয়ে খাওয়া স্মৃতি